খাঁন মোহাম্মদ মাহমুদ হাসান:

আমি পেশায় একজন ক্যারিয়ার কোচ। আমার কাজের সবচেয়ে বড় অংশ হলো, শুধু একটা কাগজের সিভির দিকে না তাকিয়ে, সেই সিভির পেছনের মানুষটাকে দেখা। দেশে-বিদেশে অনেক মানুষের সাথে কাজ করলেও, আমার কাজের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে আমাদের দেশের কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষার্থীরা। এই কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, আমাদের ছেলেমেয়েদের সম্ভাবনা যেমন অনেক, তেমনি বৈশ্বিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পথে তাদের সামনে বাধাও প্রচুর।
রফিকের গল্প:
কর্মজীবনে প্রতিনিয়ত আমাদের নানা ধরনের বাস্তব পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। আমার সাম্প্রতিক তেমনই একটি অভিজ্ঞতা আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। আমার এখনো মনে আছে সেদিন কার কথা। একটা পরিচিত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে রফিক নামের এক ছেলের সাথে দেখা হলো। ছেলেটা মাত্রই তার প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা শেষ করেছে। চোখেমুখে একদিকে পাস করার আনন্দ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে চাপা ভয়! আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “পড়াশোনা তো শেষ, এরপর কী করবে?” সে মাটির দিকে তাকিয়ে নার্ভাস হয়ে বলল যে তার কোনো ধারণাই নেই।
রফিক চোখ বেঁধে যেকোনো মেশিনের জটিল সার্কিট ঠিক করে ফেলতে পারে। ভারী যন্ত্রপাতির মেকানিক্স সে অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো বোঝে। অথচ, একটা সিভি কীভাবে বানাতে হয়, চাকরি কীভাবে খুঁজতে হয় বা ইন্টারভিউতে কীভাবে কথা বলতে হয়, এসব ভাবলেই সে ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়!
সমস্যাটা আসলে কোথায়?
রফিকের এই গল্পটা শুধু তার একার না। সারা দেশ ঘুরে আমি এমন হাজারো মেধাবী আর পরিশ্রমী তরুণ দেখেছি। তারা নিজেদের পরিবারের ভাগ্য বদলাতে চায়, কিন্তু আধুনিক চাকরির বাজারের আসল রূপটার সাথে তাদের কোনো পরিচয় নেই।
প্রতি বছর আমাদের দেশে লাখ লাখ ছেলেমেয়ে পাস করে বের হয়। আমরা ফুল দিয়ে, জমকালো অনুষ্ঠান করে তাদের বিদায় জানাই। কিন্তু ক্যাম্পাসের গেটের বাইরেই যে বেকারত্বের এক নীরব যুদ্ধ চলছে, সেটা ভুলে যাই। ডিগ্রি নিয়ে বসে থাকা এই তরুণদের মেধা বা যোগ্যতার কোনো অভাব নেই। আসল সমস্যা হলো, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যা শেখাচ্ছে আর ইন্ডাস্ট্রি বা অফিস-আদালত যা চাইছে, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক। আমরা যুগ যুগ ধরে শুধু সার্টিফিকেট দেওয়ার উপায়টাকেই নিখুঁত করেছি, কিন্তু ক্যারিয়ার কীভাবে গড়তে হয়, সেটা শেখাইনি।
সমাধান:
ক্যাম্পাসের ভেতরেই ভরসার জায়গা
এই ছেলেমেয়েদের শুধু “আরও ভালো করে চাকরি খোঁজো” বলাটা এক ধরনের অবিচার। কারণ, প্রফেশনাল দুনিয়ায় কীভাবে চলতে হয়, সেটাই তো ওদের শেখানো হয়নি! ওদের এখন আর নতুন কোনো বই বা লেকচার দরকার নেই; দরকার একটা নির্ভরযোগ্য সেতু।
শুধু পরীক্ষা শেষ হলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাদের উচিত গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব নেওয়া। এর জন্য প্রতিটি ক্যাম্পাসের ভেতরেই একটা ডেডিকেটেড ক্যারিয়ার সেন্টার থাকা প্রয়োজন।
একটু ভাবুন তো! এমন একটা ক্যাম্পাস, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা শুধু ক্লাসই করবে না, বরং নিজেদের ক্যারিয়ার গোছানোর একটা সুন্দর জায়গা পাবে।
• এক্সপার্টরা প্রথম দিন থেকেই তাদের গাইড করবেন।
• সিভি লেখা, ইন্টারভিউ দেওয়া থেকে শুরু করে অফিসের আদবকেতা শেখাবেন।
• সবচেয়ে বড় কথা, এই সেন্টারগুলো বিভিন্ন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ রাখবে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা শেষ করেই ইন্টার্নশিপ বা চাকরির সুযোগ পায়।
কিছু সফল উদ্যোগ:
ভালো খবর হলো, এটা কেবল কোনো কাল্পনিক স্বপ্ন নয়। সিলেটে আমি দারুণ একটা ‘ক্যারিয়ার হাব’ দেখলাম। দেখলাম, এক ছাত্র খুব নার্ভাস হয়ে কাউন্সেলিং সেশনে ঢুকল আর ঠিক এক ঘণ্টা পর যখন বের হলো, তার মুখে দারুণ আত্মবিশ্বাসের হাসি! বড় বড় শহরে এমন কিছু উদ্যোগ ছেলেমেয়েদের চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করছে।
তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আমাদের কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বেশি নজর দেওয়া দরকার। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ারিং, এরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ গড়বে। কিন্তু ঢাকার বাইরের এই শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি কর্পোরেট নেটওয়ার্কের বাইরে থাকে।
খুব আনন্দের বিষয় হলো, সম্প্রতি কক্সবাজারের একটি স্বনামধন্য কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে এমন একটা দারুণ উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সেখানে সার্টিফাইড ক্যারিয়ার কাউন্সিলররা একদম হাতে-কলমে কারিগরি শিক্ষার্থীদের চাকরির জন্য প্রস্তুত করছেন। এই মডেলটা প্রমাণ করে যে, সঠিক গাইডেন্স দিলে আমাদের তরুণরা কতটা বদলে যেতে পারে।
শেষ কথা:
আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, আমরা তরুণদের বাস্তব দুনিয়ার জন্য কতটা ভালোভাবে প্রস্তুত করছি তার ওপর। স্কুল, কলেজ বা পলিটেকনিকে একটা ক্যারিয়ার সেন্টার থাকা এখন আর কোনো শখ বা বিলাসিতা নয়, এটা এখন টিকে থাকার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
তাহলেই কেবল রফিকের মতো হাজারো শিক্ষার্থী যখন কষ্টার্জিত সার্টিফিকেট হাতে নেবে, তখন তাদের চোখে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ভয় থাকবে না; বরং তারা হাসিমুখে বলতে পারবে, “আমি একজন আত্মবিশ্বাসী প্রফেশনাল হিসেবে প্রস্তুত!”

খাঁন মোহাম্মদ মাহমুদ হাসান
www.kmmahmudhasan.com
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার কোচ, নেভিগেটর এবং কাউন্সিলর।